বাদুড় কি বিভীষিকা?

Share

১ . ন্যাশনাল সেন্টার ফর বায়োলজিক্যাল সাইন্সেস, টি আই এফ আর, বেঙ্গালুরু, কর্ণাটক ৫৬০০৬৫ 

২ . অশোকা ট্রাস্ট ফর রিসার্চ ইন ইকোলজি অ্যান্ড দি এনভায়রনমেনট (এ টি আর ই ই ), রয়াল অনক্লেভ, শ্রিরামাপুরা, জাক্কুর পোস্ট, বেঙ্গালুরু, কর্ণাটক ৫৬০০৬৪  

৩. ইকোসিস্টেম সার্ভিসেস গ্রুপ, ন্যাশনাল মিশন অন বায়োডাইভারসিটি অ্যান্ড হিউম্যান ওয়েলবিং 

সন্ধে নেমে আসছে। পৃথিবীর দ্বিতীয় জনবহুল দেশ ভারতবর্ষে একশো কোটি মানুষ জঙ্গল, ক্ষেত, কারখানা বা অফিস থেকে বাড়ি ফিরছে। ঠিক সেই সময় প্রায় ১২৫ টাস্বতন্ত্র প্রজাতির  প্রায় ১ কোটি বাদুড় তাদের বিশ্রাম শেষ করে বেড়িয়ে আসে গাছ, গুহা, পাথরের খাঁজ, মন্দির বা পুরনো বাড়ির থেকে। সারা রাত ধরে এরা ক্ষেতে, খামারে, জঙ্গলে, ঘাসজমিতে, এমনকি আমাদের বাড়ির আশেপাশেও পোকা ধরে খায়। এইসাব পোকার মধ্যে যেমন ফসল নষ্ট করে দেওয়া পোকামাকড় আছে, তেমনি আছে মানুষের রোগের জীবাণুর বাহক মশা। এদের মধ্যে কিছু বাদুড় মহুয়া, বুনো জাম, বুনো ডুমুর বা কাজুর মতো বিভিন্ন গাছের ফল আর মধু খায়, ফুলের রেণু আর গাছের বীজ ছড়িয়ে দেয়। অর্থনীতি আর পরিবেশ -- দুই দিকেই এদের অবদান অনস্বীকার্য।

পরিবেশ রক্ষায় বাদুড়দের ভূমিকা খুব জরুরী হলেও এদের সম্পর্কে মানুষের মনে অনেক ভুল ধারনা রয়ে গেছে। বাদুড়কে অনেকেই অশুভ লক্ষণ বা দুর্ভাগ্যের পূর্বাভাস বলে মনে করেন। বিভিন্ন গল্পে উপকথায় এমনকি সাধারন মানুষের মনেও এই নেতিবাচক ধারনা থেকে বাদুড়দের নির্যাতন করার প্রবণতা দেখা যায়। বর্তমান কোভিড-১৯ মহামারী যে সারস-কোভ২ (SARS-COV2) ভাইরাসের থেকে হয়, তা বাদুড় থেকে এসেছে (মাঝে পিপীলিকাভুক বা প্যাঙ্গলিন এর মতো প্রাণীর মাধ্যমে মানুষের মধ্যে ছড়িয়েছে) -- এর পক্ষে বৈজ্ঞানিক প্রমাণ বেশ জোরালো; যদিও বাদুড়ের ভাইরাস সাধারণত সরাসরি মানুষের মধ্যে ছড়ায় না। বাদুড় থেকে মানুষের মধ্যে এই ভাইরাস ছড়াবে এই ভয় সাধারন মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে। তার ফলে বিভিন্ন পাড়ায় বাদুড় মারার বা বাদুড় যেসব ফলের গাছে থাকে সেইসব গাছ কেটে ফেলার জন্য দাবী উঠছে৩,৪। এই দাবী কি যুক্তিযুক্ত? বাদুড় মেরে কি সত্যি লাভ হবে? এই লেখায় আমরা বাদুড়দের সম্পর্কে কিছু ভুল ধারনা ভাঙানোর চেষ্টা করবো। আলোচনা করবো পরিবেশ রক্ষায় আর মানুষের মঙ্গল সাধনে এদের তাৎপর্য।

বাদুড়দের বিশেষত্ব কি?

স্তন্যপায়ীদের মধ্যে একমাত্র বাদুড়ই একটানা উড়তে পারে। প্রজাতির সংখ্যার দিক দিয়ে বিচার করলে ইঁদুরের পরেই বাদুড়ের স্থান হবে। গোটা বিশ্বে ১২০০-র ও বেশি স্বতন্ত্র বাদুড় প্রজাতি আছে এবং প্রত্যেক বছর আমরা নতুন প্রজাতির সন্ধান পাচ্ছি। স্তন্যপায়ীদের সংখ্যার মধ্যে প্রায় ২০ শতাংশই বাদুড়রা দখল করে আছে। অন্যভাবে ভাবলে, পৃথিবীর প্রত্যেক ৫টি স্তন্যপায়ীর মধ্যে ১টি কোনো না কোনো বাদুড় প্রজাতি। শুধু সংখ্যার এই বৈচিত্রই নয়, আকারেও বাদুড়ের মতো এতো বৈচিত্র অন্য কোনো প্রাণীদের মধ্যে মেলা ভার; পৃথিবীর ক্ষুদ্রতম স্তন্যপায়ী, যার ওজন মাত্র ২ গ্রাম, সে একটি বাদুড়ের প্রজাতি যার নাম 'বাম্বল-বী' বাদুড়। আবার উড়ুক্কু শেয়াল (ফ্লাইং ফক্স) নামের বাদুড় প্রজাতির ওজন প্রায় ১.৫ কেজি, তার ডানার দৈর্ঘ্য প্রায় ২ মিটারের কাছাকাছি। এই বাদুড়টির কাছে দু'রাত্রের মধ্যে ৫০০ কিমি দূরত্ব অতিক্রম করা মামুলি ব্যাপার। এতো বৈচিত্রের মধ্যেও একটি ব্যাপারে বাদুড়রা একইরকম, মোটামুটি সকলেই (৭০ শতাংশের বেশি) পোকামাকড় খেয়ে বাঁচে অথবা ফল আর মধু খেয়ে বাঁচে (ফ্রুট ব্যাট)। আমেরিকা মহাদেশের মাত্র তিনটি বাদুড় প্রজাতি রক্তখেকো বলে জানা যায়। ভারতে প্রায় ১২৮টি স্বতন্ত্র প্রজাতির বাদুড় আছে যার মধ্যে ১২টি ফলাহারী।

বাদুড়ের বাসস্থানও বৈচিত্রে ভরা -- উঁচু পাহাড় হোক বা ক্রান্তীয় চিরসবুজ অরণ্য, মরুভূমি বা শহুরে কংক্রিট, কোথাওই বাদুড়ের দেখা পাওয়া অস্বাভাবিক নয়। গুহার মধ্যে বা গাছের কোটরে, এমনকি গাছের ডালে বা বাড়ির ছাদেও বাদুড় বাসা বানাতে ওস্তাদ। কিছু বাদুড় প্রজাতি একা বাসা বাঁধলেও, অধিকাংশই বেশ সামাজিক প্রাণীদের মতো দল বেঁধে বাস করে। পৃথিবীর সবচেয়ে বড় পোকামাকড়-খেকো বাদুড়ের দল আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রে টেক্সাসের ব্র্যাকেন কেভ নামের গুহায় বাসা বেঁধে আছে। এখানে প্রায় ২ কোটি মেক্সিকান ফ্রী-টেইলড বাদুড় (Tadarida brasiliensis) বাস করে -- পৃথিবীর মধ্যে সবচেয়ে বড় স্তন্যপায়ীদের জমায়েত । নতুন দিল্লির সব মানুষ একটাই গুহায় বাস করলে যেমন হত, ব্যাপারটা খানিকটা সেরকম।

বাদুড়দের নিয়ে আমাদের মাথা ঘামানোর প্রয়োজন কিসের?

পরিবেশ আর অর্থনীতি দুই দিক দিয়েই বাদুড় আমাদের অনেক উপকার করে -- প্রাকৃতিক কীট-নাশকের ভূমিকা তো আছেই, সাথে ফুলের পরাগমিলন বা গাছের বীজ ছড়িয়ে দিতে বা প্রাকৃতিক সারের যোগান দিতে বাদুড়ের জুড়ি মেলা ভার। পোকামাকড়-খেকো বাদুড়রা ফসলের জন্য ক্ষতিকর অনেক পোকামাকড় খেয়ে নেয়, এমনকি রোগজীবাণু বহন করে এরকম পোকা (যেমন, মশা)-ও বাদুড়ের খাবারে পরিণত হয়। নিজেদের দেহের ওজনের প্রায় অর্ধেক থেকে দুই তৃতীয়াংশ ওজনের পোকামাকড় সাফ করে বাদুড়রা ফসলের ক্ষতি কমায় এবং স্বাভাবিকভাবেই কীটনাশকের ব্যবহারও কমায়। থাইল্যান্ডে একটি গবেষণায় দেখা গেছে, পোকামাকড় খেয়ে নিয়ে বাদুড়রা প্রায় ১০ লক্ষ মার্কিন ডলার মূল্যের চাল ক্ষতির হাত থেকে বাঁচিয়েছে, যা ২৬,০০০ মানুষের এক বছরের খাবার। গোটা বিশ্বের নিরিখে, বাদুড়রা না থাকলে পোকামাকড়-জনিত এই ক্ষতি ৫,৪০০ কোটি থেকে ১ লক্ষ কোটি মার্কিন ডলারের সমতুল্য হতে পারত।

অনেক fruit-bat বা ফলাহারী বাদুড়ের প্রজাতি ফুলের পরাগমিলন করায় আর গাছের বীজ ছড়ায়, যার ফলে মানুষের ব্যবহার্য কাঠ, খাদ্যশস্য, তন্তু, ফল, রং, ওষুধ ইত্যাদিঅতিপ্রয়োজনীয় সামগ্রী আদৌ তৈরী হতে পারে। বিশ্বের সমগ্র খাদ্যসামগ্রীর প্রায় এক তৃতীয়াংশ এবং প্রধান ১১৩টি খাদ্যশস্যের মধ্যে ৮৭টির উৎপাদনের জন্য পতঙ্গ, বাদুড় বা পাখির উপর আমরা নির্ভরশীল, প্রতি বছর যা প্রায় ২০,০০০ কোটি মার্কিন ডলারের সমতুল্য। ভারতের সবচেয়ে সাধারণ তিনটি বাদুড়ের প্রজাতি -- যাদের বিজ্ঞানসম্মত নাম যথাক্রমে, Pteropus giganteus, Rousettus leschenaulti এবং Cynopterus sphinx, ১১৪টিরও বেশি গাছের পরাগমিলন আর বীজ ছড়ানোয় প্রত্যক্ষ ভূমিকা পালন করে। এই গাছগুলির অধিকাংশেরই পরিবেশগত বা অর্থনৈতিক বা ওষধি গুরুত্ব রয়েছে, যাদের মধ্যে বন্য প্রজাতির কলা, পেয়ারা, কাজু, আম, ডুমুর, মহুয়া এবং আরো অনেক ফল রয়েছে। ভারতের কাজু-চাষিদের কাছে বাদুড়ের বাসা ভালোমানের বীজ সংগ্রহের একটা সহজ মাধ্যম। যদিও এইসব ফলাহারী বাদুড়রা নিজেরাই ফসলের ক্ষতি করতে পারে, কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তারা অত্যধিক পাকা ফল খাওয়া পছন্দ করে বলে, এই ক্ষতি একেবারেই নগণ্য। প্রচুর পরিমানে নাইট্রোজেন আর ফসফরাস থাকার জন্য গুহা থেকে সংগ্রহ করা বাদুড়ের মল ( গুয়ানো ) বহুক্ষেত্রেই ফসলে প্রাকৃতিক সার হিসাবে ব্যবহৃত হয়। সহজ কথায়, আমাদের জীবনে বাদুড়দের সাহায্য ছাড়া খাদ্যদ্রব্যের উৎপাদন অনেক কমে যেত আর পোকামাকড়ের উৎপাত অনেক বেড়ে যেত।

নতুন উদয় হওয়া সংক্রামক রোগ: বাদুড় আর মানুষের স্বাস্থ্যের যোগাযোগ

যক্ষা বা সাধারণ সর্দিজ্বর, এইসব ছোঁয়াচে রোগের সাথে আমরা সবাই পরিচিত, বছরের পর বছর এই রোগগুলি আমাদের উপর হামলা করে আসছে। অন্যদিকে নতুন কিছু ছোঁয়াচে রোগ, যেমন, সার্স (SARS), এইচ-আই-ভি (HIV), ইবোলা (Ebola), জিকা (Zika) এবং সম্প্রতি কোভিড-১৯ মানবসমাজে ভয়ঙ্কর দাগ কেটেছে। এইসব নতুন বা অজানা বাহক দ্বারা সংক্রামিত রোগগুলিকে নতুন উদয় হওয়া সংক্রামক রোগ (Emerging Infectious Diseases) বলা হয়। এই ধরণের ছোঁয়াচে রোগগুলির অধিকাংশই অন্যান্য প্রাণীদের মধ্যে প্রথমে দেখা দেয় আর তারপর মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। একে বৈজ্ঞানিক পরিভাষায় বলে 'স্পিল ওভার' (spill-over)। সাম্প্রতিককালে এই স্পিল-ওভার গুলি যখনই ঘটেছে, সেগুলি ছড়িয়ে পড়ে মহামারির আকার ধারণ করেছে, যার একটির মধ্যে দিয়ে আমরা বর্তমানে যাচ্ছি। মজার ব্যাপার হল, এই ধরণের স্পিল-ওভারের মধ্যে অনেকগুলিই বিগত ২০-৩০ বছরে ঘটেছে। এখানে স্বভাবতই প্রশ্ন আসে, এধরণের সংক্রমণ কেনই বা ঘটে চলেছে আর এদের আটকানোর উপায়ই বা কি?

স্পিল-ওভার বা মনুষ্যেতর প্রাণী বা বাহক থেকে জীবাণুর এই যে মানুষের মধ্যে সংক্রমণ, এগুলি অত্যন্ত দুর্লভ ঘটনা১০ এবং তখনই ঘটে যখন মানুষ আর রোগের বাহক বন্য প্রাণীর মধ্যে সংযোগ অতিমাত্রায় বাড়ে। এধরণের সংক্রমণের ঘটনাগুলি পর্যবেক্ষণ করে দেখা গেছে যে, সেগুলি সেই এলাকাতেই বেশি ঘটেছে, যেখানে জনঘনত্ব খুব বেশি এবং বহু প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণী একসাথে বাস করে এবং সর্বোপরি যেখানে শিকার বা অরণ্য-ধ্বংসের ফলে মানুষ প্রকৃতিতে বড়োসড়ো পরিবর্তন এনেছে১১। বিগত ২০-৩০ বছরে জমির ব্যবহার ও মানচিত্রের এই যে বিপুল পরিবর্তন, এটাই রোগের বাহক বিভিন্ন বন্য প্রাণী, মূলত বাদুড় আর মানুষের মধ্যে সংযোগ বাড়িয়েছে। ফলত এইসব রোগের সংক্রমণও বেড়েছে।

বর্তমানের অনেক সংক্রামক রোগেরই উৎস হিসাবে বাদুড়কে চিহ্নিত করা হয়। বাদুড়ের দেহে অসংখ্য ভাইরাস বাস করে, যাদের অধিকাংশই আমাদের কাছে অপরিচিত, এবং অনেকগুলিই মানুষের কোনো ক্ষতি করেনা১২। যদিও নিপাহ (Nipah), হেন্ডরা (Hendra), মারবার্গ (Marburg), ইবোলা (Ebola) এবং শ্বাসযন্ত্রের পীড়াদায়ক রোগ (Severe Acute Respiratory Syndrome বা সার্স-কোভ-১ এবং সার্স-কোভ-২)-সৃষ্টিকারী করোনা-ভাইরাস (coronavirus) বাদুড়ের থেকেই ছড়িয়েছে বলে জানা যায়। এই রোগগুলির ক্ষেত্রে বাদুড় প্রাকৃতিক আধার বা বাহকের কাজ করে। প্রশ্ন হল, এই ভাইরাস-গুলি মানবদেহে সংক্রমণ ঘটায় কিভাবে? বিরল কয়েকটি ক্ষেত্রে এই সংক্রমণ সরাসরি বাদুড় থেকে মানুষের দেহে ঘটেছে, যেমনটি ঘটেছিল বাংলাদেশে নিপা (Nipah) রোগের প্রাদুর্ভাবের সময়। সেখানে বাদুড়ের মলমূত্র বা লালা মিশে থাকা পচানো খেজুররস বা তাড়ি পান করে মানুষ অসুস্থ হন১৩,১৪। বাদুড়ের দেহ থেকে প্রত্যক্ষভাবেও মানুষের শরীরে বিভিন্ন রোগ প্রবেশ করতে পারে, যেমন বাদুড়ের কামড় থেকে হওয়া জলাতঙ্ক অথবা বাদুড়ের মাংস খেয়ে হওয়া ইবোলা (Ebola) (ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গো-তে ২০০৭ সালে হওয়া ইবোলা মহামারীর পিছনে সদ্য মারা বাদুড়ের মাংস খাওয়াই কারণ হিসাবে গণ্য করা হয়১৫) এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ। মজার ব্যাপার হল এই যে, বাদুড়ে কামড়ানো বা আধখাওয়া ফল খেয়ে মানুষ ছাড়াও অন্যান্য প্রাণী যেমন গোরিলা বা শিম্পান্জী-ও ইবোলা-তে আক্রান্ত হয়েছে বলে জানা যায়১৪। তবে অনেক ক্ষেত্রেই সরাসরি বাদুড় থেকে মানুষের দেহে না এসে, কিছু কিছু ভাইরাস কোনো মধ্যবর্তী বাহকের মাধ্যমে মানুষকে সংক্রামিত করে। সাম্প্রতিককালে সার্স (SARS), মার্স (MERS) এবং কোভিড-১৯ (CoVid-19) এর মতো মারণরোগ বাদুড় থেকে প্রথমে মধ্যবর্তী বাহক, যথাক্রমে ভাম বা খট্টাস, উট এবং পিপীলিকাভুক-এর দেহে ছড়িয়েছে, তারপর মানুষকে সংক্রামিত করেছে।

অবাক করার মতো ব্যাপার হল এই যে, বাদুড়ের দেহে এতরকমের ভাইরাস বাস করলেও বাদুড়কে কিন্তু তারা একেবারেই কাবু করতে পারেনা। এর কারণ বুঝতে বিজ্ঞানীরা এখনও চেষ্টা চালিয়ে গেলেও, একটি ব্যাপার বেশ পরিষ্কার, রোগজীবাণুকে হারানোয় সাফল্যের সাথে বাদুড়ের ওড়ার ক্ষমতার যোগ আছে১৬,১৭,১৮,১৯। ওড়ার জন্য বাদুড়ের শরীরে যে প্রচন্ড ধকল যায়, তারই ফলস্বরূপ তাদের দেহে বিষাক্ত পদার্থ উৎপন্ন হয়। এই বিষাক্ত পদার্থ সাধারণত শরীরের পক্ষে ক্ষতিকারক হলেও, বিবর্তনের নিয়মে বাদুড়ের শরীরে এই বিষ-ই অমৃতের কাজ করে -- রোগজীবাণুকে প্রতিহত করে আর ভাইরাস-এর সংক্রমণ রোধ করে। মানুষের শরীরে জীবাণুর আক্রমণের ফলস্বরূপ একাধিক অতিপ্রতিক্রিয়া (জ্বর-যন্ত্রণা-জ্বালা ইত্যাদি) দেখা দেয় যা শরীরের অনেক ক্ষতি করে। বাদুড়ের দেহে এধরণের প্রতিক্রিয়া সীমিত থাকে এবং বার্ধক্যজনিত দীঘস্থায়ী (chronic) রোগও এদের সহজে কাবু করতে পারেনা। সহজ কথায়, ওড়ার ক্ষমতা অর্জন করতে গিয়ে বাদুড়ের শরীরের প্রতিরোধ ক্ষমতা তাদের একাধিক রোগের বিরুদ্ধেও জয়ী করে দিয়েছে। এই একই কারণে বাদুড় বাঁচেও বহুদিন, স্তন্যপায়ীর নিরীখে এবং দেহের অনুপাতে বাদুড়ের এই লম্বা আয়ু নিঃসন্দেহে অবাক করার মতই। রোগ প্রতিহত করার দিক দিয়ে বাদুড়দের কাছ থেকে  তাই আমরা অনেক কিছু শিখতে পারি। 

বর্তমান সঙ্কটের মাঝে বাদুড় কি উদ্বেগের কারণ?

বর্তমান অতিমারীর মধ্যে জনমানসে বাদুড় নিয়ে উদ্বেগের অন্ত নেই। কিন্তু আমাদের বুঝতে হবে যে কোভিড-১৯ রোগটি কিন্তু মানুষই আরেক মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দিচ্ছে, কোনো বাদুড় নয়। কার্যত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বন্য বাদুড় নিয়ে গবেষণাই থামিয়ে দেওয়া হয়েছে যাতে করে মানুষের থেকে বাদুড়রা সংক্রামিত না হয়ে পড়ে। কিন্তু কোনোভাবেই বাদুড়ের বাসা নষ্ট করা বা বাদুড়দের নির্মূল করার চেষ্টা বুদ্ধিমত্তার পরিচয় নয়। এতে বরং হিতে বিপরীত হওয়ার সম্ভাবনা থেকে যায়। প্রথমত এই প্রক্রিয়ায় বাদুড় আর মানুষের মধ্যে সংযোগ বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে, যার ফলে নতুন কোনো অজানা রোগ মানুষের দেহে চলে আসতেই পারে। আর দ্বিতীয়ত অত্যধিক উৎপীড়নে বাদুড় আরো বেশিমাত্রায় জীবাণু ছড়ায় বলে জানা যায়। এসব না ভেবে শুধু বাদুড়-নিধন করলে ফসলের ক্ষতি, মশা বা আরো পোকামাকড়ের ছড়ানো রোগের প্রাদুর্ভাব এসবই আমাদের পোহাতে হবে, লাভের লাভ কিছুই হবেনা। নানারকম ফলপাকুড়, মহুয়া ছাড়া সে এক রসকষহীন দুনিয়া হবে, বলাই বাহুল্য। কাজেই বুদ্ধিমানের কাজ হবে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে যে স্বাভাবিক সহাবস্থান চলে এসেছে তাই চালিয়ে যাওয়া। চটজলদি সতর্কতা হিসাবে এটা মাথায় রাখা প্রয়োজন যে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে বাদুড়ের সংস্পর্শ এড়িয়ে চলাই শ্রেয় -- বাদুড় না খাওয়া বা না ছোঁয়া, বাদুড়ে কামড়ানো বা আধখাওয়া ফল অথবা বাদুড়ের মলমূত্র-লালা দ্বারা দূষিত হতে পারে এরকম ফল না খাওয়া -- বাদুড় থেকে মানুষে রোগের সংক্রমণের সম্ভাবনা অনেকটাই কমাতে পারে। দীর্ঘকালীন পদক্ষেপ হিসাবে জমি বা জঙ্গলের ব্যবহারে পরিবর্তন আনা প্রয়োজন যাতে করে রোগজীবাণুর বাহক এরকম বন্য প্রাণীদের সাথে মানুষের সংযোগ কমানো যায় এবং বন্যপ্রানীদেরও কম নিপীড়িত হতে হয়। প্রকৃতি আর জীববৈচিত্রের পুনরুদ্ধার আর সংরক্ষণের জন্য বিশ্বব্যাপী সার্বজনীন প্রচেষ্টাই পারে ভবিষ্যতে এরকম মহামারীর হাত থেকে মানবসভ্যতাকে রক্ষা করতে।

স্বীকৃতি :

প্রফেসর সত্যজিৎ মেয়র, ডঃ ইয়ান মেনডেলহল, ডঃ রবি চেল্লাম এবং কাদম্বরী দেশপানডে তাদের মন্তব্য, ইনপুট এবং পরামর্শ ডিয়ে আমাদের সাহায্য করেছেন। এজন্য আমরা তাদের কাছে কৃতজ্ঞ। 

রেফারেন্স:

১. Talmale SS, Saikia U.(2018) A Checklist of Indian Bat Species. ZSI
২. Kunz, T. H., Braun, D. T. E., Bauer, D., Lobova, T., & Fleming, T. H. (2011). Ecosystem services provided by bats. Annals of the New York Academy of Sciences, 1223, 1.
৩. https://bangaloremirror.indiatimes.com/bangalore/cover-story/bats-are-bengalurus-enemy-no-1-now/articleshow/75240633.cms
৪. https://timesofindia.indiatimes.com/city/hyderabad/covid-19-fear-may-affect-bat-population-say-biologists/articleshow/75000386.cms
৫. Roberts, B. J., Catterall, C. P., Eby, P., & Kanowski, J. (2012). Long-distance and frequent movements of the flying-fox Pteropus poliocephalus: implications for management. PLoS One, 7(8).
৬. Wanger, T. C., Darras, K., Bumrungsri, S., Tscharntke, T., & Klein, A. M. (2014). Bat pest control contributes to food security in Thailand. Biological Conservation, 171, 220-223.
৭. Naylor, R, & Ehrlich, PR (1997). Natural pest control services and agriculture. Nature's Services: societal dependence on natural ecosystems, 151-174.
৮. IUCN SSC (2014). IUCN SSC Guidelines for Minimizing the Negative Impact to Bats
and Other Cave Organisms from Guano Harvesting. Ver. 1.0. IUCN, Gland.
৯. http://www.batcon.org/
১০. Plowright, R. K., Parrish, C. R., McCallum, H., Hudson, P. J., Ko, A. I., Graham, A. L., & Lloyd-Smith, J. O. (2017). Pathways to zoonotic spillover. Nature Reviews Microbiology, 15(8), 502.
১১. Allen T, Murray KA, Zambrana-Torrelio C, Morse SS, Rondinini C, Di Marco M, Breit N, Olival KJ, Daszak P. Global hotspots and correlates of emerging zoonotic diseases. Nature communications. 2017 Oct 24;8(1):1-0.
১২. Calisher, C. H., Childs, J. E., Field, H. E., Holmes, K. V., & Schountz, T. (2006). Bats: important reservoir hosts of emerging viruses. Clinical microbiology reviews, 19(3), 531-545.
১৩. Islam, M. Saiful, et al. "Nipah virus transmission from bats to humans associated with drinking traditional liquor made from date palm sap, Bangladesh, 2011–2014." Emerging infectious diseases 22.4 (2016): 664.
১৪. Dobson, A. P. (2005). What links bats to emerging infectious diseases?. Science, 310(5748), 628-629.
১৫. Leroy, E. M., Epelboin, A., Mondonge, V., Pourrut, X., Gonzalez, J. P., Muyembe-Tamfum, J. J., & Formenty, P. (2009). Human Ebola outbreak resulting from direct exposure to fruit bats in Luebo, Democratic Republic of Congo, 2007. Vector-borne and zoonotic diseases, 9(6), 723-728.
১৬. Brook CE, Dobson AP (2015) Bats as ‘special’ reservoirs for emerging zoonotic pathogens. Trends in microbiology. 1;23(3):172-80.
১৭. Banerjee, A., Baker, M. L., Kulcsar, K., Misra, V., Plowright, R., & Mossman, K. (2020). Novel insights into immune systems of bats. Frontiers in Immunology, 11, 26.
১৮. Ahn, Matae, et al. "Dampened NLRP3-mediated inflammation in bats and implications for a special viral reservoir host." Nature microbiology 4.5 (2019): 789-799.
১৯. Kacprzyk J, Hughes GM, Palsson-McDermott EM, Quinn SR, Puechmaille SJ, O'neill LA, Teeling EC (2017) A potent anti-inflammatory response in bat macrophages may be linked to extended longevity and viral tolerance. Acta chiropterologica. 30;19(2):219-28.